কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF) এ বছর তার ৩০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে, যা বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের এক অনন্য মহোৎসব। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া এই উৎসবটি কেবলমাত্র বাংলা কিংবা ভারতীয় চলচ্চিত্রের নয়, বরং বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়। চলুন, বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক এবারের উৎসবের আয়োজন, মূল আকর্ষণ, এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
১৯৯৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব সিনেমার সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের এক সেতুবন্ধন রচনা করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। KIFF বর্তমানে ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দ্য অ্যাসোসিয়েশন দ্য ফিল্ম প্রোডিউসার্স (FIAPF) দ্বারা স্বীকৃত একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
৩০তম সংস্করণ: বিশেষ আকর্ষণ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগ দ্বারা আয়োজিত কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের 30 তম সংস্করণ রাজ্যের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায় 4 - 11 ডিসেম্বর, 2024 এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংক্ষেপে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ফিল্ম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন বা FIAPF দ্বারা স্বীকৃত, 30 তম KIFF সিনেমা প্রেমীদের কাছে আরও উত্তেজনাপূর্ণ, আবেদনময় এবং সন্তোষজনক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় কারণ তারা জয় সিটিতে বিশ্বমানের সিনেমার আকর্ষণ অনুভব করতে থাকবে।
১. থিম ও উৎসর্গ
এবারের উৎসবটি বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। এই উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, এবং মৃণাল সেনের মতো কিংবদন্তি পরিচালকদের কাজগুলিকে বিশেষভাবে প্রদর্শিত করা হবে।
২. উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ও অতিথি
উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হবে একজন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক পরিচালক দ্বারা পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র, যার নাম ইতিমধ্যেই উৎসুক চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল জাগিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলিউড এবং টলিউডের বিখ্যাত তারকা, পাশাপাশি কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব।উপস্থিত ছিলেন দেব থেকে শুরু করে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, শত্রুঘ্ন সিনহা, প্রমুখ। হাজির ছিল টলিউডের একটা বিরাট অংশ। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেব, সৌরভ এবং শত্রুঘ্নকে পাশে নিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনা করেন।ছিলেন দীপঙ্কর দে, দুলাল লাহিড়ী, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, প্রমুখ। হাজির ছিলেন শতাব্দী রায়, দেবলীনা কুমার, পাওলি দাম, সৌমিতৃষা কুন্ডু, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন শত্রুঘ্ন সিনহা এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা জানান। থালি গার্ল হিসেবে ছিলেন অভিনেত্রী তৃণা সাহা। দেব এদিন সংবর্ধনা জানান পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়কে।
৩. প্যানেল ডিসকাশন ও ওয়ার্কশপ
বিভিন্ন প্যানেল আলোচনায় থাকবেন চলচ্চিত্র সমালোচক, পরিচালক, এবং প্রযুক্তিবিদরা। বিশেষ ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হবে যেখানে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা শিল্পের কারিগরি ও সৃজনশীল দিক সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করবেন।
প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের বিভাগসমূহ
১. ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এখানে প্রতিযোগিতা করবে।
২. আধুনিক বাংলা সিনেমা
এই বিভাগে সাম্প্রতিক বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য কাজগুলি প্রদর্শিত হবে।
৩. ট্রিবিউট অ্যান্ড রেট্রোস্পেকটিভ
চলচ্চিত্র শিল্পের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হবে এই বিভাগে।
৪. বিশেষ প্রদর্শনী
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নির্বাচিত কিছু ক্লাসিক চলচ্চিত্র এখানে প্রদর্শিত হবে।এ বছর কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ২১ দেশের ১৭৫টি চলচ্চিত্র দেখানো হবে। আরও দেখানো হবে ৩০টি স্বল্পদৈর্ঘের সিনেমা। এবারের উৎসবের ‘ফোকাস কান্ট্রি’ ফ্রান্স। ফ্রান্সের ২১টি চলচ্চিত্র দেখানো হবে। তবে এবারের উৎসবে নেই বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র।
উৎসব চলবে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কলকাতার ২০টি প্রেক্ষাগৃহ ও মিলনায়নে উৎসবে অংশ নেওয়া চলচ্চিত্র দেখানো হবে।
উৎসবস্থল ও সময়সূচি
উৎসবটি কলকাতার বিভিন্ন আইকনিক স্থানে অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে রয়েছে নন্দন, রবীন্দ্র সদন, নজরুল তীর্থ, এবং শিশির মঞ্চ। উৎসব চলবে সাত দিনব্যাপী, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত।
টিকিট ও প্রবেশ
অনলাইনে এবং অফলাইনে টিকিট বুকিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় এবং পাসের ব্যবস্থা রয়েছে।
চলচ্চিত্র উৎসবের গুরুত্ব
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কেবল একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর স্থান নয়; এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি, সমাজ এবং ভাবনার মেলবন্ধনের এক মহৎ মাধ্যম। বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে আগত চলচ্চিত্র নির্মাতারা এবং দর্শকেরা একত্রিত হয়ে এখানে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মঞ্চ তৈরি করেন।
উপসংহার
৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার এবং নতুন দিগন্তের সন্ধানে এক অনবদ্য যাত্রার সূচনা করেছে। যারা সত্যিকারের সিনেমাপ্রেমী, তাদের কাছে এটি একটি অমূল্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। বাংলা এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই মহা মিলন উৎসব প্রত্যেক দর্শককে এক অনন্য অনুভূতির সঙ্গে বেঁধে রাখবে।
No comments:
Post a Comment