কলকাতা, ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী, তার উপনিবেশিক ইতিহাসের জন্য আজও স্মরণীয়। এই শহরের প্রতিটি অলিগলি, স্থাপত্য, এবং পথের মোড়ে মিশে রয়েছে এক গভীর ঐতিহ্য। কলকাতার হেরিটেজ ওয়াক শুধুমাত্র পর্যটনের একটি অংশ নয়; এটি এক বিস্মৃত অতীতের দ্বারোদ্ঘাটন।
ঐতিহ্যের পথচলা: কীভাবে শুরু করবেন?
কলকাতার বিভিন্ন প্রাচীন স্থানের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্য ভ্রমণ শুরু করতে পারেন। শহরের পুরনো অঞ্চলগুলি যেমন বউবাজার, কলেজ স্ট্রিট, শ্যামবাজার, এবং ধর্মতলা ইতিহাসের নানা গল্পের স্বাক্ষর বহন করে।
কীভাবে পরিকল্পনা করবেন:
গাইডেড ট্যুর: কলকাতার ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখানোর জন্য অনেক পেশাদার গাইড পাওয়া যায়।
স্বনির্ভর ভ্রমণ: একটি ভালো মানচিত্র এবং শহরের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই আপনি নিজের মতো করে শুরু করতে পারেন।
ছবি তোলা: প্রতিটি স্থাপনার ছবি তুলুন, কারণ এগুলি আপনাকে কলকাতার উপনিবেশিক যুগের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করবে।
কলকাতার কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থান ও তাদের ইতিহাস
১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল:
ইংরেজ আমলের এক অমূল্য স্থাপত্য। ১৯২১ সালে নির্মিত, এটি মূলত রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে তৈরি। এর সাদা মার্বেলের কাঠামো এবং ভেতরের মিউজিয়াম আপনাকে এক ভিন্ন যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।আগাগোড়া শ্বেত পাথরের তৈরি মহারানি ভিক্টোরিয়ার নামাঙ্কিত এই স্মৃতিসৌধটি বর্তমানে একটি জাতীয় প্রদর্শনীশালা জাদুঘর এবং কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ।বেলফাস্ট সিটি হলের স্থাপত্যশৈলীর আদলে ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের নকশা প্রস্তুত করেন স্যার উইলিয়াম এমারসন। প্রথমে তাকে ইতালীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যশৈলীতে স্মৃতিসৌধের নকশা প্রস্তুত করতে বলা হলেও, তিনি শুধুমাত্র ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রয়োগের বিরোধিতা করেন এবং ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীর সঙ্গে মুঘল উপাদান যুক্ত করে মূল সৌধের নকশা প্রস্তুত করেন। ভিনসেন্ট এসচ ছিলেন এই সৌধের অধীক্ষক স্থপতি। সৌধ-সংলগ্ন বাগানটির নকশা প্রস্তুত করেছিলেন লর্ড রেডেসডেল ও স্যার জন প্রেইন। কলকাতার মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি সংস্থার ওপর নির্মাণকার্যের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল।
২. সেন্ট জন’স চার্চ:
১৭৮৭ সালে নির্মিত, এটি কলকাতার অন্যতম পুরাতন গির্জা। এখানেই রয়েছে জব চার্নকের সমাধি, যিনি কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।স্থপতি জেমস এগ দ্বারা নির্মিত, সেন্ট জন'স গির্জাটি ইট এবং পাথরের সংমিশ্রণে নির্মিত এবং এটি সাধারণত "পাথুরে গির্জা" (স্টোন চার্চ) নামে পরিচিত ছিল। 18 শতকের শেষদিকে কলকাতায় পাথর ছিল একটি বিরল উপাদান । পাথরগুলি গৌরের মধ্যযুগীয় ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছিল এবং হুগলি নদীতে পাঠানো হয়েছিল । গির্জার অফিসের মিনিট বইটি সেন্ট জন'স গির্জা নির্মাণের জন্য গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ কীভাবে লুট করা হয়েছিল তার কাহিনী বিশদভাবে বর্ণনা করে।
৩. কুমারটুলি:
কুমারটুলি কেবল মূর্তিশিল্পীদের পাড়া নয়; এটি এক প্রাচীন বাঙালির শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। ঐতিহ্যবাহী কুমারদের হাতে তৈরি প্রতিমা কলকাতার ঐতিহ্যকে আজও জীবন্ত রাখে।এই অঞ্চলটি ‘পটুয়াপাড়া’ বা মৃৎশিল্পীদের বসতি অঞ্চল হিসেবে বিখ্যাত। কুমারটুলি অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের দক্ষতার কথা সর্বজনবিদিত। কলকাতার এই অঞ্চল থেকে দেবীদেবতার প্রতিমা কেবলমাত্র শহরের সর্বজনীন ও ঘরোয়া পুজোর জন্যই সরবরাহ করা হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই তা দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হয়। কুমারটুলি পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত হস্তশিল্প (মৃৎশিল্প) কেন্দ্রও বটে।শোভাবাজার সুতানুটিতে অবস্থিত কুমোরটুলি ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে। ১৭ শতকের গোরা থেকে কুমোরটুলির ইতিহাস ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে যখন কৃষ্ণনগর থেকে কুমোররা এসে বসবাস করতে শুরু করেছিল কলকাতায়। প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল ১৬০৬ সালে। অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলার মহারাজা ভবানী মজুমদার দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। পরে নবদ্বীপ,শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর(পূর্ব নাম রেউই গ্রাম) থেকে কুমোররা ভালো আয়ের আসায় এই কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। এরপর ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব কলকাতায় দুর্গাপুজো শুরু করেন। তখনকার দিনে কুমোররা জানত না যে সিংহ কি রকম দেখতে হয় তাই রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়ির দুর্গা প্রতিমায় সিংহের জায়গায় ঘোড়ার রূপ দেওয়া হয়। সেটির প্রচলন আজ অব্দি অব্যাহত।
৪. কলেজ স্ট্রিট:
কলেজ স্ট্রিট হল মধ্য কলকাতার একটি ১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা। বউবাজার অঞ্চলের গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ-এর মোড় থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড মোড় পর্যন্ত এই রাস্তাটি প্রসারিত।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় , কলকাতা মেডিকেল কলেজ , প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি , দ্য সংস্কৃত কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি , সিটি কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইত্যাদির মতো অসংখ্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি থেকে এর নামটি এসেছে। রাস্তাটিতে অনেক কেন্দ্র রয়েছে। কলকাতা শহরের কয়েকটি প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রধান বই প্রকাশনা ও বিক্রয় কেন্দ্রটি এই রাস্তার ধারে অবস্থিত।এটি শুধু বইয়ের বাজার নয়, এটি জ্ঞান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার এক কেন্দ্র। এখানে কফি হাউসের ইতিহাসও অবিচ্ছেদ্য।কলেজ স্ট্রিট কলকাতার প্রধান বই প্রকাশনা ও বিক্রয় কেন্দ্র। তাই এই অঞ্চলটিকে বইপাড়া বলা হয়।আনন্দ পাবলিশার্স, দে'জ পাবলিশিং, রুপা অ্যান্ড কোং, দেব সাহিত্য কুটীর, সাহিত্যম, পত্র ভারতী প্রভৃতি প্রধান বাংলা প্রকাশনা সংস্থাগুলির প্রধান কার্যালয় এখানেই অবস্থিত। রাস্তার দুধারে বই-এর অনেক ছোটো ছোটো দোকান আছে। এখানে পুরনো ও নতুন বই পাওয়া যায়।স্মিথসোনিয়ান পত্রিকার একটি নিবন্ধে কলেজ স্ট্রিট সম্পর্কে বলা হয়েছে, "...(কলেজ স্ট্রিট) আধ-কিলোমিটার লম্বা বইয়ের দোকানে ভরা রাস্তা। এর দুপাশের ফুটপাথে প্রত্যেকটি ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত বইপত্র পাওয়া যায়। এমনকি ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডে আউট-অফ-প্রিন্ট হয়ে যাওয়া অনেক বইই এখানে পাওয়া যায়।"যে বই কলেজ স্ট্রীট এ পাওয়া যাই না সেই বই এর কোনো অস্তিত্ব নাই বলা হয়.
৫. ট্রাম ও ট্রামলাইন:
ট্রাম কলকাতার উপনিবেশিক ইতিহাসের এক চলমান প্রমাণ। ট্রামের যাত্রাপথ আপনাকে নিয়ে যাবে শহরের অতীতের কোণায় কোণায়।ট্রাম যান সাধারণত প্রধান লাইন এবং দ্রুত ট্রানজিট ট্রেনের তুলনায় হালকা এবং ছোট হয়। বেশিরভাগ ট্রাম বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে, সাধারণত একটি ওভারহেড লাইনে একটি প্যান্টোগ্রাফ স্লাইডিং দ্বারা খাওয়ানো হয় ; পুরোনো সিস্টেমে ট্রলি পোল বা বো কালেক্টর ব্যবহার করা যেতে পারে । কিছু ক্ষেত্রে, তৃতীয় রেলের একটি যোগাযোগ জুতা ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনে, তাদের দ্বৈত শক্তি ব্যবস্থা থাকতে পারে—শহরের রাস্তায় বিদ্যুৎ এবং আরও গ্রামীণ পরিবেশে ডিজেল। মাঝে মাঝে, ট্রামও মাল বহন করে । কিছু ট্রাম, যা ট্রাম-ট্রেন নামে পরিচিত , এর সেগমেন্ট থাকতে পারে যা মূল লাইনের রেলপথে চলে, আন্তঃনগর ব্যবস্থার মতো। রেল পরিবহনের এই মোডগুলির মধ্যে পার্থক্যগুলি প্রায়শই অস্পষ্ট থাকে এবং সিস্টেমগুলি একাধিক বৈশিষ্ট্য একত্রিত করতে পারে।
ঐতিহ্য ভ্রমণের গুরুত্ব
কলকাতার হেরিটেজ ওয়াক শুধুমাত্র প্রাচীন স্থাপনা বা স্থাপত্যের সাথে পরিচিত হওয়া নয়, এটি কলকাতার সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার একটি মাধ্যম।
ইতিহাসের সংরক্ষণ: হেরিটেজ ওয়াক আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে পুরনো ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা যায়।
জীবনধারা ও সংস্কৃতি: এই ভ্রমণ আপনাকে দেখাবে বাঙালির জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সাথে রূপান্তরিত হয়েছে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশ: ঐতিহ্য ভ্রমণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যটন শিল্পও বিকশিত হয়।
বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে আত্মীয়তা
বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ চিরকালীন। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্থানে ঘুরতে গিয়ে আপনি অনুভব করবেন বাঙালির জীবনযাত্রার এক অনন্য ছাপ। এই ভ্রমণ শুধুমাত্র ইতিহাসের পাঠ নয়; এটি এক ধরনের নস্টালজিয়া।
উপসংহার
কলকাতার ঐতিহ্য ভ্রমণ একান্তই এক অভিজ্ঞতা। এটি আপনাকে শহরের অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যতের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করবে। সময়ের পরিক্রমায় এই স্থানগুলি হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু এদের প্রতিটি ইট-পাথরে আজও লেগে রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস।
No comments:
Post a Comment