ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাঙালি বিপ্লবীদের অবদান অনস্বীকার্য। এই বীর যোদ্ধারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন জাতির মুক্তির জন্য। তাঁদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং আদর্শ আজও আমাদের প্রেরণার উৎস। এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব সেইসব বিখ্যাত বাঙালি বিপ্লবীদের জীবন ও তাঁদের অনন্য আত্মত্যাগ নিয়ে।
বিপ্লবের ভূমিকা: বাঙালির অগ্রগণ্যতা
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি বিপ্লবীরা ছিলেন অগ্রণী। ব্রিটিশ শাসনের শোষণ থেকে মুক্তির জন্য তাঁরা সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে চিন্তাধারার বিপ্লব পর্যন্ত নানান পথ অবলম্বন করেছেন। যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি, এবং ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি প্রভৃতি সংগঠন গড়ে তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করেন।
বিপ্লবীদের জীবন ও আত্মত্যাগ
ক্ষুদিরাম বসু (৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ — ১১ আগস্ট ১৯০৮):
ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা বিস্ফোরণ করেন। যদিও পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং তিনি ধরা পড়েন, তবু তাঁর ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ের সাহসিকতা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ক্ষুদিরাম প্রফুল্ল চাকির সঙ্গে মিলে গাড়িতে ব্রিটিশ বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড আছেন ভেবে তাকে গুপ্তহত্যা করার জন্যে বোমা ছুঁড়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড অন্য একটা গাড়িতে বসেছিলেন, যে ঘটনার ফলে দুজন ব্রিটিশ মহিলার মৃত্যু হয়, যারা ছিলেন মিসেস কেনেডি ও তার কন্যা। প্রফুল্ল চাকি গ্রেপ্তারের আগেই আত্মহত্যা করেন। ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। দুজন মহিলাকে হত্যা করার জন্যে তাঁর বিচার হয় এবং চূড়ান্তভাবে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়।
ফাঁসি হওয়ার সময় ক্ষুদিরামের বয়স ছিল ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ১১ দিন, যেটা তাকে ভারতের কনিষ্ঠতম ভারতের বিপ্লবী অভিধায় অভিষিক্ত করেছিল। বাল গঙ্গাধর তিলক, তার সংবাদপত্র কেশরীতে দুজন নবীন যুবককে সমর্থন করে আওয়াজ তোলেন অবিলম্বে স্বরাজ চাই। যার ফল হয় অবিলম্বে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার দেশদ্রোহিতার অপরাধে তিলককে গ্রেপ্তার করে।
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু (২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭)
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি নেতা। ভারতের স্বাধীনতা-অর্জন আন্দোলনে তিনি হলেন এক অতি-উজ্জ্বল ও মহান চরিত্র, যিনি নির্দ্বিধভাবে এই মহাসংগ্রামে নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি নেতাজি নামে সমধিক পরিচিত। সুভাষচন্দ্র বসু পরপর দু’বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু, মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত, কংগ্রেসের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা এবং বিরুদ্ধ-মত প্রকাশ করার জন্য তাকে পদত্যাগ করতে হয়।ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে এগারো বার কারারুদ্ধ করে। তাঁর চির-অমর উক্তি— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তাঁর মতাদর্শের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের দুর্বলতাকে সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে। জাপানিদের সহযোগিতায় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং পরে তিনি নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই বাহিনীর সৈনিকেরা ছিলেন মূলত ভারতীয় যুদ্ধবন্দি এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর। জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে (বর্তমান মায়ানমার) যুদ্ধ পরিচালনা করেন।ভারতের স্বাধীনতার জন্য ওনার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিনয়, বাদল, দীনেশ
কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণের ঘটনা আজও এক গৌরবময় অধ্যায়। ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার সিম্পসনের উপর আক্রমণ করে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, বাঙালি বিপ্লবীরা শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পিছপা হবেন না।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের সক্রিয় সদস্য বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে কারা বিভাগের ইনস্পেকটর জেনারেল সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন এবং তাদের আক্রমণে একাধিক উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারী আহত হন। এরপর রাইটার্স বিল্ডিং-এর অলিন্দে লালবাজার থেকে আসা সশস্ত্র পুলিশের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবী বিনয়-বাদল-দীনেশের যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।
বিনয় বসু আত্মহত্যা করেন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে।
বাদল গুপ্ত সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
দীনেশ গুপ্তকে ব্রিটিশরা ফাঁসি দেয়।
সূর্য সেন(22 মার্চ 1894 - 12 জানুয়ারী 1934)
সূর্য সেন, যিনি "মাস্টারদা" নামে পরিচিত, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নেতৃত্ব দেন। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে ধরা পড়ার পর অকথ্য নির্যাতন করে ফাঁসি দেওয়া হয়।সূর্য কুমার সেন যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত, তার ডাকনাম ছিল কালু। ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। পূর্ববঙ্গে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নিজ জীবন বলিদান করেন। সূর্যসেনের বাহিনী কয়েকদিনের জন্যে ব্রিটিশ শাসনকে চট্টগ্রাম এলাকা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। সূর্য সেনের অন্যতম সাথী বিপ্লবী অনন্ত সিংহের ভাষায় "কে জানতো যে আত্মজিজ্ঞাসায় মগ্ন সেই নিরীহ শিক্ষকের স্থির প্রশান্ত চোখ দুটি একদিন জ্বলে উঠে মাতৃভূমির দ্বিশতাব্দীব্যাপি অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হবে? ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমনের জন্য বর্বর অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিশোধ, জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ! কে জানতো সেই শীর্ণ বাহু ও ততোধিক শীর্ণ পদযুগলের অধিকারী একদিন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ রাজশক্তির বৃহত্তম আয়োজনকে ব্যর্থ করে - তার সমস্ত ক্ষমতাকে উপহাস করে বৎসরের পর বৎসর চট্টগ্রামের গ্রামে গ্রামে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলবে?"তার সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়।
বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়)(৭ ডিসেম্বর ১৮৭৯ – ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫)
"বাঘা যতীন" নামে পরিচিত, তিনি একক হাতে একটি বাঘকে হত্যা করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ অস্ত্রাগারে আক্রমণ করেন। ব্রিটিশ সেনার সাথে যুদ্ধে তিনি আহত হন এবং পরবর্তীতে শহিদ হন।ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। বাঘা যতীন ছিলেন বাংলার প্রধান বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে কলকাতায় জার্মান যুবরাজের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে তিনি জার্মানি থেকে অস্ত্র ও রসদের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান প্লট তারই মস্তিষ্কপ্রসূত।
সশস্ত্র সংগ্রামের এক পর্যায়ে সম্মুখ যুদ্ধে উড়িষ্যার বালেশ্বরে তিনি গুরুতর আহত হন এবং বালাসোর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করার পর তিনি সাঁটলিপি ও টাইপ শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের স্ট্যানোগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত হন। যতীন ছিলেন শক্ত-সমর্থ ও নির্ভীক চিত্তধারী এক যুবক। অচিরেই তিনি একজন আন্তরিক, সৎ, অনুগত এবং পরিশ্রমী কর্মচারী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। একই সঙ্গে তার মধ্যে দৃঢ় আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধ জন্মেছিল।
বিপ্লবীদের চিন্তাধারা এবং আদর্শ
বাঙালি বিপ্লবীরা শুধু সশস্ত্র সংগ্রামেই নয়, তাঁদের আদর্শ ও চিন্তাধারায়ও প্রভাবশালী ছিলেন।
বিপ্লবী আন্দোলনে যুবসমাজের ভূমিকা: তাঁরা যুবসমাজকে প্রেরণা দিয়েছিলেন আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের পথে এগিয়ে যেতে।
বন্দেমাতরম ও ভারতের জন্য ত্যাগের প্রতীক: বাঙালি বিপ্লবীদের আদর্শ ছিল ভারতের মাটি, মাতৃভূমি, এবং তার সংস্কৃতি রক্ষা করা।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন: তাঁরা স্বদেশী পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছেন।
তাঁদের আত্মত্যাগের তাৎপর্য
বাঙালি বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ শুধু স্বাধীনতার পথই সুগম করেনি, জাতির মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাঁরা দেখিয়েছেন, সাহসিকতার মাধ্যমে শাসকের শোষণ ভেঙে ফেলা সম্ভব।
তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আমাদের সমাজে ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
উপসংহার
বাঙালি বিপ্লবীদের জীবন এবং আত্মত্যাগ আমাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কখনও উপহার নয়, এটি অর্জিত। আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁদের জীবন এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা চিরন্তন।
No comments:
Post a Comment