শিরোনাম: ডিজিটাল যুগে বাংলা ক্যালিগ্রাফি: বাংলা লিপি সংরক্ষণের আধুনিক পন্থা
ভূমিকা
বাংলা লিপি শুধুমাত্র একটি ভাষার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম সঙ্গী। একসময় হাতে লেখা ক্যালিগ্রাফি ছিল শিল্পের এক উৎকর্ষ, যা আমাদের সাহিত্যিক এবং চিত্রকরদের এক অসামান্য পরিচিতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কাগজের ব্যবহার কমে গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফির নতুন পথ তৈরি হয়েছে। আজকের এই আলোচনায় আমরা জানব কীভাবে ডিজিটাল যুগে বাংলা ক্যালিগ্রাফি টিকে রয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
বাংলা ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস
প্রাচীন বাংলা লিপি:
বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছিল প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে। পাল রাজবংশের সময়ে বাংলা লিপি তার নিজস্ব স্বকীয়তা অর্জন করে।
মধ্যযুগের বাংলা ক্যালিগ্রাফি:
কাব্যগ্রন্থের পাতায়, মন্দিরের প্রাচীরে, এবং তাম্রফলকে ক্যালিগ্রাফির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সেকালের হাতে লেখা পুঁথি এবং কাব্য ছিল ক্যালিগ্রাফির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আধুনিক যুগের সূচনা:
ছাপাখানার আগমনের পরেও বাংলা হাতে লেখা লিপি তার গুরুত্ব হারায়নি।
ডিজিটাল যুগে বাংলা ক্যালিগ্রাফি
কম্পিউটার ও টাইপোগ্রাফি:
ফন্ট ডিজাইনের ক্ষেত্রে ইউনিকোড ব্যবহারের ফলে বাংলা লিপির ডিজিটাল রূপান্তর সহজ হয়েছে। অনেক ডিজাইনার এবং প্রযুক্তিবিদ আজ নতুন নতুন ফন্ট তৈরি করছেন, যা ক্যালিগ্রাফির সৃজনশীলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
গ্রাফিক ডিজাইন সফটওয়্যার:
অ্যাডোব ইলাস্ট্রেটর, কোরেলড্র, এবং প্রোক্রিয়েটের মতো সফটওয়্যার বাংলা ক্যালিগ্রাফি ডিজাইন করার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বাংলা ক্যালিগ্রাফির আধুনিক পদ্ধতি
1. ডিজিটাল ফন্ট:
ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা ক্যালিগ্রাফি জনপ্রিয় করার অন্যতম পদ্ধতি হল বাংলা ফন্ট ডিজাইন। উদাহরণস্বরূপ, "শোভা," "আনন্দ," এবং "অভ্র" ফন্টগুলি ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
2. ইলেকট্রনিক পেন ও ট্যাবলেট:
ডিজিটাল পেন এবং ট্যাবলেটের সাহায্যে এখন হাতে লেখা ক্যালিগ্রাফি সহজে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর করা যায়।
3. অনলাইন প্ল্যাটফর্ম:
বাংলা ক্যালিগ্রাফির প্রচারের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলা ক্যালিগ্রাফি সংরক্ষণে উদ্যোগ
শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্যোগ:
বাংলা ক্যালিগ্রাফি সংরক্ষণ এবং প্রসারের জন্য স্কুল-কলেজে ক্যালিগ্রাফি শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আজ ক্যালিগ্রাফি এবং টাইপোগ্রাফি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে।
সরকারি এবং বেসরকারি সহায়তা:
বাংলা লিপি ও ক্যালিগ্রাফি সংরক্ষণের জন্য সরকারি অনুদান এবং বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা:
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর মতো প্রতিষ্ঠান বাংলা লিপির প্রদর্শনী এবং কর্মশালা আয়োজন করতে পারে।
ডিজিটাল সংরক্ষণ:
বাংলা ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিপি নিয়ে যারা কাজ করেন:
লিপি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাজের ধরণ ভিন্ন ভিন্ন দেখা যায়। কেউ লিপির প্রাচীন পাঠোদ্ধারে জীবন কাটিয়ে দেন। কেউ নতুন লিপি তৈরির কাজ করেন, যাকে লিপিকার(Calligrapher/Calligraphist) বলা হয়। আবার লিপি নিয়ে শিল্পকলা করেন যিনি, তাকে লিপিশিল্পী(Calligraphy Artist) বলে।
প্রত্নতত্ত্বের সাথে শিলালিপির পাঠোদ্ধার(decipher) বিষয়টি জড়িত। ছাপাখানা, বই হাতে লেখা, প্রচ্ছদ, বই অলঙ্করণ প্রভৃতির সাথে নতুন লিপি বা প্রচলিত লিপির নতুন সংস্করণ করেন লিপিকার।
আর শিল্পকলায় লিপিকে অনুসঙ্গ করে কিংবা লিপি দিয়েই শিল্পকর্ম করেন লিপিশিল্পীরা। আমাদের ঢাকার চারুকলায় প্রাচ্যকলা বিভাগে এ বিষয়ে তালিম দেয়া হয়।
তবে অধিকাংশ ভাষার লিপি দিয়ে এখন আর শিল্পকলার প্রবাহমান ধারা লক্ষ্য করা যায় না। এক্ষেত্রে চীনা ও জাপান বা কোরীয় লিপি চিত্রের অনুসঙ্গ হিসেবে এখনও টিকে আছে। আর আরবি লিপি নিজেই একটি জীবন্ত শিল্পকলা হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ধারা এবং আধুনিক শিল্পকলা হিসেবে প্রবহমান।
বাংলা ভাষা লিখতে বিভিন্ন লিপির ব্যবহার
এ অঞ্চলে মুসলিম ও ইংরেজ আমলে আরবি, ফারসি বা উর্দু হরফে বাংলা লেখা ছাড়াও সিলেটি, নাগরি, কায়থি, উড়িয়া, নেওয়ারি, রোমান ও আসামি লিপিতে বাংলা গ্রন্থ রচনার নজির রয়েছে।
মুসলিম আমলে মুসলিম এবং হিন্দু লেখক নির্বিশেষে আরবি-ফার্সি হরফে বাংলা পুথি লিখেছেন। ঢাবির পুথিশালায় রক্ষিত আরবি হরফে লেখা বাংলা ভাষার তেত্রিশটি পুথির কথা জানা যায়। এর অধিকাংশের লিপিকালের হদিস নেই। তবে গবেষকরা বলছেন, এগুলো ১৮ শতকের আগে লেখা। এগুলো সৈয়দ সুলতানসহ অপরাপর মুসলিম লেখকদের রচিত। বাংলা ভাষার পুথি আরবি হরফে কেন লেখা হলো? ইতিহাসে দেখা যায়, সুলতানি আমলে (১২০৪-১৫৭৬ ঈসায়ি) প্রাপ্ত প্রায় সব শিলালিপি বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও উৎকৃষ্ট আরবি ক্যালিগ্রাফিতে করা হয়েছে। সুতরাং সাধারণের কাছে আরবি ভাষা সহজপাঠ্য ও গ্রহণীয় ছিল। এই তেত্রিশটি পুথির প্রায় সবক’টি ধর্মীয় বিষয়ে লেখা। জনগণের চাহিদা মোতাবেক এবং পাঠের সুবিধার্থে এগুলো আরবি হরফে লেখা হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।
আর ৬০ দশকের শেষ দিকে চট্টগ্রামে জুলফিকার আলি আরবি-ফার্সি (উর্দু) লিপিতে একটি বাংলা পত্রিকাও বের করতেন বলে জানা যায়।
প্রাচীনকাল থেকে বলা যায়, ঈসায়ীপূর্ব তিন হাজার বছর থেকে বাংলা লিপি যাত্রা শুরু করেছে। বলা হয়, বাংলা ভূখণ্ডের বাইরের ব্রাহ্মী লিপি থেকে বাংলা লিপির উৎপত্তি। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা ভূখণ্ডের ভেতর থেকেই এ লিপি ‘নাগরী লিপি’ বা ‘ব্রাহ্মী লিপি’ (যা থেকে নাগরী লিপির জন্ম বলে দাবি করা হয়) থেকে জাত নয়; বরং তা স্বাধীনভাবে উদ্ভুত। আরও জানা যায়, ‘বাংলা’ লিপি ব্রাহ্মণদের হাতে তৈরি নয়, এ দেশের-ই প্রাচীন আমলের সাংখ্য-যোগ-তন্ত্রবাদী বা তাদেরও পূর্বপুরুষদের-ই মহান কীর্তি। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, আরবি, নাগরি ইত্যাদি বর্ণমালার প্রত্যেকটি হচ্ছে, একেকটি ‘দেবাক্ষর’। প্রত্যেকটি আরবি হরফের যেমন এক একজন অধিপতি ফেরেশতা আছে বলে কল্পনা করা হয়েছে; তেমনি প্রত্যেকটি নাগরি বর্ণেও আছে এক একজন অধিপতি দেবতা। একইভাবে ‘বাংলা’-বর্ণেরও যে প্রতিটিরই এক একটি দেবতা বা দেবী আছে, নতুন এ তথ্যটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাই বর্তমান সময় থেকে অতি নিম্নস্তরের ভারতীয় বাঙালি এবং বাংলাদেশি বাঙালিরা (মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে) দাবি করতে পারবে, নাগরি লিপির মতো বাংলা লিপিও ‘দেবাক্ষর’ এবং ‘ধর্মাক্ষর’ও বটে। আর তা ব্রাহ্মণদের নয়; তাদের-ই প্রায় তিন হাজার বছর আগেকার পূর্বপুরুষের অবদান।
আজকের আলোচনা এ পর্যন্ত। সবাইকে বাংলা হরফের ক্যালিগ্রাফি ভুবনে স্বাগতম।
বাংলা ক্যালিগ্রাফির চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা
চ্যালেঞ্জ:
1. ডিজিটাল মাধ্যমের আগ্রাসনে হাতে লেখা ক্যালিগ্রাফি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
2. বাংলা ফন্ট ডিজাইনে বৈচিত্র্যের অভাব এখনও একটি বড় সমস্যা।
3. ক্যালিগ্রাফি শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং প্ল্যাটফর্মের অভাব।
সম্ভাবনা:
1. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি শেখা আরও সহজ হয়েছে।
2. সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে তরুণ প্রজন্ম বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
3. আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা ক্যালিগ্রাফি তুলে ধরার সুযোগ বেড়েছে।
উপসংহার
বাংলা ক্যালিগ্রাফি আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতির অন্যতম ধন। ডিজিটাল যুগে বাংলা লিপি নতুন রূপে ফিরে এসেছে, যা আমাদের ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির সেতুবন্ধন তৈরি করছে। যদিও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও ক্যালিগ্রাফি সংরক্ষণ এবং প্রসারের জন্য সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলা লিপি তার গৌরবময় পরিচয় ধরে রাখতে সক্ষম হবে।